পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে ভোট


আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা (PR): সুবিধা ও অসুবিধা

পিআর (Proportional Representation – PR) পদ্ধতি, বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা, এমন একটি নির্বাচন পদ্ধতি যেখানে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে যে পরিমাণ ভোট পায়, তার আনুপাতিক হারে আইনসভায় আসন লাভ করে। এটি প্রচলিত ‘উইনার-টেক-অল’ (Winner-Takes-All) ব্যবস্থার বিপরীত, যেখানে যে প্রার্থী বা দল সবচেয়ে বেশি ভোট পায়, সেই এককভাবে সেই আসনের জয়ী হয়। পিআর পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো জনগণের ভোটকে আইনসভায় সঠিকভাবে প্রতিফলিত করা, যাতে প্রতিটি দলের প্রাপ্ত জনসমর্থন সংসদে সরাসরি প্রতিফলিত হয়।


পিআর পদ্ধতির সুবিধা

পিআর পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। এই পদ্ধতিতে ছোট দলগুলোও সংসদে তাদের স্থান করে নিতে পারে, যা তাদের মতামত প্রকাশ এবং নীতি নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এর ফলে, সমাজের বিভিন্ন অংশ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের কণ্ঠস্বর আইনসভায় শোনা যায়, যা গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। প্রচলিত ‘উইনার-টেক-অল’ ব্যবস্থায় প্রায়শই দেখা যায় যে, একটি দল অল্প সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হলেও, তার প্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিপুল সংখ্যক ভোট ‘নষ্ট’ হয়ে যায়, কারণ তাদের প্রার্থী আসন পায় না। পিআর পদ্ধতিতে ‘নষ্ট ভোট’ এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, কারণ প্রতিটি ভোটই কোনো না কোনো দলের আসন প্রাপ্তিতে অবদান রাখে।

পিআর পদ্ধতি সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার হ্রাস করে। যেহেতু কোনো একক দল সাধারণত নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে না, তাই সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা এবং জোট গঠনের প্রয়োজন হয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও বোঝাপড়া বাড়ায় এবং স্বেচ্ছাচারী শাসনের প্রবণতা কমিয়ে আনে। এর ফলে, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আরও বেশি আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এটি কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক করে না, বরং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমন্বয়ের সংস্কৃতিও গড়ে তোলে।

এছাড়াও, পিআর পদ্ধতি রাজনৈতিক বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করে এবং জেরিম্যান্ডারিং প্রতিরোধে সহায়ক। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিয়ে কারসাজি করা এই পদ্ধতিতে কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ আসন বন্টন মোট ভোটের শতাংশের উপর ভিত্তি করে হয়, নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ফলাফলের উপর নয়। এটি ভোটারদের মধ্যে কম মেরুকরণ সৃষ্টি করে, কারণ দলগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে হয়, যা তাদের চরম অবস্থান থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করে। এতে ভোটাররা তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সরাসরি একটি দলকে সমর্থন করতে পারেন, যা তাদের পছন্দকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করে।


পিআর পদ্ধতির অসুবিধা

পিআর পদ্ধতির বেশ কিছু অসুবিধাও রয়েছে। এর প্রধান এবং সবচেয়ে আলোচিত অসুবিধা হলো অস্থিতিশীল সরকার গঠনের প্রবণতা। যেহেতু কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না, তাই জোট সরকার গঠন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এই জোটগুলো প্রায়শই মতাদর্শগত ভিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল হতে পারে, যার ফলস্বরূপ ঘন ঘন সরকারের পতন এবং নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। এটি দেশের নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এই পদ্ধতিতে ভোটদাতার সঙ্গে প্রার্থীর সরাসরি সম্পর্ক কম থাকে। ভোটাররা একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার প্রার্থীর পরিবর্তে সাধারণত একটি দলের তালিকা বা প্রতীকে ভোট দেন। এর ফলে, ভোটাররা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন না এবং তাদের ‘নিজস্ব এমপি’ কে, তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিতে পারে, কারণ তারা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার ভোটারদের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না।

পিআর পদ্ধতি উগ্রবাদী বা ছোট দলের উত্থান ঘটাতে পারে। এমনকি সামান্য সংখ্যক ভোট পেয়েও এই দলগুলো আইনসভায় প্রবেশাধিকার পেতে পারে, যা দেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং উগ্রবাদী মতাদর্শকে বৈধতা দিতে পারে। সরকার গঠন প্রক্রিয়া জটিল ও দীর্ঘ হতে পারে। বিভিন্ন দলের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং নীতি নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও দর কষাকষি চলতে পারে, যা অনেক সময় অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। একটি ছোট দলও তাদের এজেন্ডা চাপিয়ে দিতে পারে, যদিও তাদের জনসমর্থন খুব কম।

এছাড়াও, কিছু পিআর পদ্ধতিতে ব্যালট পেপার বেশ জটিল হতে পারে, যেখানে ভোটারদের একাধিক প্রার্থীকে পছন্দ অনুযায়ী ক্রমিক নম্বরে সাজাতে হয়। এটি ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে এবং ভোটার উপস্থিতি কমিয়ে দিতে পারে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই ব্যবস্থায় খুব কমই সুযোগ পান, কারণ পিআর ব্যবস্থা মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর উপর নির্ভরশীল।


উপসংহার

পিআর পদ্ধতি গণতন্ত্রকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রতিনিধিত্বমূলক করার একটি শক্তিশালী উপায়। এটি নিশ্চিত করে যে প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজের প্রতিটি অংশের প্রতিনিধিত্ব আইনসভায় প্রতিফলিত হয়। তবে, এর সহজাত কিছু দুর্বলতা রয়েছে, বিশেষ করে সরকার গঠনে অস্থিতিশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতার ঝুঁকি। একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে পিআর পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাগুলি ভিন্নভাবে অনুভূত হতে পারে। একটি কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা তৈরির জন্য পিআর পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাগুলো সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে একটি স্থিতিশীল ও প্রতিনিধিত্বমূলক উভয় ধরনের সরকারই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।